অর্থকাগজ প্রতিবেদন
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক আমদানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা, উচ্চ শুল্ক এবং বহুজাতিক ক্রেতাদের উৎস বহুমুখীকরণের কৌশলের ফলে দীর্ঘদিনের শীর্ষ সরবরাহকারী চীনের বাজার হিস্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে শিপমেন্ট ও রফতানি আয় কিছুটা কমলেও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক সরবরাহকারী দেশের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। তবে একই সঙ্গে পরিসংখ্যান বলছে, চীন থেকে সরে যাওয়া বিপুল ক্রয়াদেশের পুরো সুযোগ এখনো কাজে লাগাতে পারেনি দেশের পোশাক খাত। বরং ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ৮ দশমিক ১ শতাংশ কম। তবে এই পতনকে পুরোপুরি নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানিই কমেছে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিক বাজার সংকুচিত হলেও বাংলাদেশের রফতানি তুলনামূলক কম হারে কমেছে। ফলে দ্বিতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী হিসেবে দেশের অবস্থান অক্ষুণ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিজেদের নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী করেছে ভিয়েতনাম। আলোচ্য সময়ে দেশটির তৈরি পোশাক রফতানি ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিপরীতে দীর্ঘদিনের শীর্ষ রফতানিকারক চীন বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। মার্কিন বাজারে চীনের পোশাক রফতানি মূল্য ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। পরিমাণের দিক থেকেও দেশটির সরবরাহ প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল। অর্থাৎ বড় বড় ব্র্যান্ড এখন এককভাবে চীনের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প উৎস থেকে পণ্য সংগ্রহে গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে নতুন সুযোগ তৈরি হলেও সেই সুযোগের সবচেয়ে বড় অংশ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে।
ওটেক্সার তথ্য বলছে, জানুয়ারি-মে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ইন্দোনেশিয়ার পোশাক রফতানি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার রফতানি ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে ভারতের রফতানি কমেছে ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ। বিশেষ করে কম্বোডিয়ার প্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো দ্রুত নতুন উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজে নিচ্ছে এবং প্রতিযোগিতায় যারা দ্রুত সাড়া দিতে পারছে তারাই বেশি লাভবান হচ্ছে।
বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখলেও চীন থেকে সরে আসা বিপুল ক্রয়াদেশের বড় অংশ এখনো দেশের দখলে আসেনি। এর অন্যতম কারণ উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি সংকট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, দীর্ঘ লিড টাইম, অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ এবং উচ্চ মূল্য সংযোজিত পোশাক উৎপাদনে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নতুন চাহিদা পূরণে প্রতিযোগী দেশগুলো অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে দ্রুত সাড়া দিতে পারছে।
তবে বছরের শুরুতে দুর্বল প্রবণতার পর সর্বশেষ মাসিক পরিসংখ্যান কিছুটা আশাবাদ তৈরি করেছে। মে মাসে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রফতানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৬ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানি বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ বাজারে চাহিদা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর যে আভাস মিলছে, বাংলাদেশও তার সুফল পেতে শুরু করেছে।
শিপমেন্ট কমলেও মূল্য ধরে রাখতে পেরেছে বাংলাদেশ
রফতানির পরিমাণ কমলেও মূল্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক শক্তিশালী। জানুয়ারি থেকে মে সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ১ দশমিক ০৯ বিলিয়ন স্কয়ার মিটার ইক্যুইভ্যালেন্ট (এসএমই) পোশাক রফতানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ কম। তবে একই সময়ে প্রতি এসএমই পোশাকের গড় মূল্য মাত্র ২ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৯৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা দুর্বল থাকলেও বাংলাদেশি রফতানিকারকেরা অতিরিক্ত মূল্য ছাড় দিয়ে বাজার ধরে রাখার পথে হাঁটেননি। বরং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল মূল্য বজায় রেখেই রফতানি অব্যাহত রেখেছেন। এটি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মূল্য প্রতিযোগিতায় কোথায় বাংলাদেশ
ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে বৈশ্বিক গড় ইউনিট মূল্য ছিল প্রতি এসএমই ৩ দশমিক ১৪ ডলার। বাংলাদেশের গড় মূল্য ছিল ২ দশমিক ৯৯ ডলার, যা বৈশ্বিক গড়ের কিছুটা নিচে হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বেশি।
চীনের গড় ইউনিট মূল্য ছিল মাত্র ১ দশমিক ৪৩ ডলার, পাকিস্তানের ২ দশমিক ৫৯ ডলার এবং কম্বোডিয়ার ২ দশমিক ৯১ ডলার। অর্থাৎ এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশ বেশি মূল্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে ভিয়েতনাম (৩ দশমিক ৩৯ ডলার), ভারত (৩ দশমিক ৪১ ডলার), হন্ডুরাস (৩ দশমিক ৬৪ ডলার), ইন্দোনেশিয়া (৩ দশমিক ৭৭ ডলার) এবং মেক্সিকো (৪ দশমিক ৪৫ ডলার) বাংলাদেশের তুলনায় বেশি ইউনিট মূল্য পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের গড় মূল্য সবচেয়ে কম হওয়ার কারণ দেশটি বিপুল পরিমাণ স্বল্পমূল্যের পণ্য সরবরাহ করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভৌগোলিক নৈকট্য, দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং উচ্চ মূল্য সংযোজিত পণ্যের কারণে মেক্সিকো সর্বোচ্চ গড় মূল্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়াও প্রযুক্তিনির্ভর ও উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনের মাধ্যমে বেশি মূল্য আদায় করছে।
সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন কৌশলগত পরিবর্তন
বিশ্ব পোশাক বাণিজ্যের বর্তমান পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও সতর্কবার্তা বহন করছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখা দেশের পোশাক শিল্পের সক্ষমতার প্রমাণ। অন্যদিকে চীনের হারানো বাজারের বড় অংশ প্রতিযোগী দেশগুলোর হাতে চলে যাওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে শুধু কম উৎপাদন ব্যয় বা বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ মূল্য সংযোজিত পোশাক উৎপাদন, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক (ম্যান-মেইড ফাইবার) পোশাকের অংশ বাড়ানো, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, বন্দর ও লজিস্টিকস উন্নয়ন, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দ্রুত ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীন থেকে সরে আসা ক্রয়াদেশের বড় অংশই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের দখলে আসতে পারে। বর্তমান পরিসংখ্যান তাই শুধু অবস্থান ধরে রাখার গল্প নয়; বরং বৈশ্বিক বাজার পুনর্বিন্যাসের এই সময়ে বাংলাদেশের সামনে উন্মুক্ত হওয়া নতুন সম্ভাবনা এবং প্রতিযোগিতামূলক চ্যালেঞ্জ—দুটোরই স্পষ্ট প্রতিফলন।
সর্বশেষ হালনাগাদ 17 hours আগে

